খালেদা ইয়াসমিন মুক্তা: শেখ হাসিনার নির্দেশে গুম করে অমানবিকভাবে খুন ইলিয়াস আলীকে বলেছে জিয়াউল আহসান
সিলেট থেকে ঢাকায় ফিরেছিল ইলিয়াস আলী, সন্ধ্যায় দলীয় একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। মিটিংয়ের জন্যে তিনি যান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে।
হোটেলে আগে থেকেই র্যাব এবং ডিজিএফআইয়ের ডেথ স্কোয়াডের টিমরা তার উপর নজরদারি রাখছিল। তারা হোটেলে থেকে র্যাবের অফিসারদেরকে ইলিয়াস সব আপডেটগুলো দিচ্ছিল।
মিটিং শেষে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরাও তার পিছু নিচ্ছিল।
গাড়িটা বনানীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পরপরই বড় একটা মাইক্রোবাস থেকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন এসে ইলিয়াস আলীর গাড়িটা আটকায়। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই ইলিয়াস আলী এবং তার ড্রাইভারকে টেনেহিঁচড়ে জোর করে তোলা হয় মাইক্রোবাসে।
তারপর ইলিয়াস আলীকে নিয়ে যাওয়া হয় র্যাব-১ এর আয়নাঘরে। সেখানে নিয়েই প্রচন্ড মারধর করা হয় তাকে।
প্রথমদিকে মারধর করার পর গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন ইলিয়াস আলীকে ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ এবং বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারতের ট্রানজিট নিয়ে প্রতিবাদ করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। মূলত ভারতের বিরোধিতা করার কারণেই ইলিয়াস আলীকে এভাবে তু্লে নেয়া হয়েছিল।
এই জিজ্ঞাসাবাদের পরপরই তার উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। তারপর মোটা লাঠি দিয়ে শরীর উল্টো করে পিটাতে থাকে এবং ইলেকট্রিক শক দিতে থাকে। এভাবে ৪-৫ দিন যাবত অমানুষিক নির্যাতন চলতে থাকে তার উপর।
অন্যদিকে ইলিয়াস আলীর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা তাকে না পেয়ে হন্য হয়ে চারদিকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও খুঁজে না পেয়ে তারা ইলিয়াস আলীর একটা ছবি নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে যায় যাতে খুঁজে পেতে সহজ হয়।
সেদিন হাসিনা ইলিয়াস আলীর পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল ইলিয়াস আলীকে খুঁজে পেতে সে সাহায্য করবে। এমনকি ইলিয়াস আলীর ছোট্ট মেয়ে সায়ারার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল- তোমার বাবাকে আমি খুঁজে এনে দিব।
হাসিনার এমন কথায় তারাও ভরসা পেয়েছিল ,ভেবেছি তাদের বাবাকে খুঁজে পাবে।
কিন্তু ইলিয়াস আলীর পরিবারের সাথে কথা বলার পরপরই হাসিনা কল দেয় র্যাব অফিসার জিয়াউল আহসান এবং ডিজিএফআইয়ের অফিসারদেরকে। কল দিয়ে ইলিয়াস আলীকে চূড়ান্ত গুম করে দেয়ার কথাটাও বলে।
হাসিনার নির্দেশ পাওয়ার পরপরই র্যাব এবং ডিজিএফআইয়ের অফিসাররা মিলে রাতের দিকে ইলিয়াস আলীকে অমানবিকভাবে হ*ত্যা করে। হ*ত্যা করার পর লা*শ গুম করে দেয়ার জন্যে নিয়ে আসা হয় ধলেশ্বরী নদীতে।
তারপর পেট কেটে ,কোমরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লা*শ ফেলে দেয় নদীতে। কোমরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা হয় যাতে লা*শ আর ভেসে না উঠে, কেউ খুঁজে না পায়।
ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনা এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তখনও তাদের বাবাকে হন্য হয়ে খুঁজে চলছিল। হাসিনাও বারবার নাটক করে বলছিল- তোমাদের বাবাকে খুঁজে এনে দিব।
অথচ কিছুদিন আগে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মামুন ধরা পড়ার পর স্বীকার করেছে হাসিনার নির্দেশেই গুম করে খু*ন করা হয়েছিল ইলিয়াস আলীকে।
ইলিয়াস আলী বিএনপির ত্যাগী নেতা ছিলেন। সিলেটের বহু মানুষ পছন্দ করতো তাকে। ভারতের বিরোধিতা করাতেই হাসিনার নির্দেশে গুম করে অমানবিকভাবে খু*ন করা হলো তাকে।
অথচ নিজ দলের যেই কর্মীরা গুমের শিকার হয়েছিল সেই গুম অধ্যাদেশকেই এখন বাতিল করে দিতে চায় বিএনপি সরকার। গুমের শিকার হওয়া মানুষগুলোর আর্তনাদটাও মনে রাখেনি তারা।
গতবছর ড. ইউনূসের দক্ষ হস্তক্ষেপে গুম হওয়া অনেকেই আয়নাঘর থেকে বের হয়েছিল। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনা আশায় ছিল তার স্বামী বেঁচে থাকলে সেও হয়তো ফিরে আসবে।
লুনা তখনও জানতো না তার স্বামী যে বেঁচে নেই। ইলিয়াস আলীর ছেলেমেয়েরাও জানতো না তাদের বাবাকে হ*ত্যা করা হয়েছে। তারাও আশায় ছিল বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়।
এখন তারা জানে তাদের বাবা আর বেঁচে নেই, কিন্তু মানতে পারে না। বাবার কথা মনে পড়লেই এখনো হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে তারা। মনের ভেতর আশা রাখে হয়তো একদিন তাদের বাবা ফিরবে।
কিন্তু তাদের অবুঝ মনকে কে বুঝাবে তাদের বাবা আর ফিরবে না, কোনদিনও না
(লেখাটার মূল অংশটা আমার লেখা “আয়নাঘর” বই থেকে নেয়া)
– Ibrahim Khalil Shawon